এখনও ওরা আছে (পর্ব ৩)

লিখছেন শঙ্খচিল

বেশ খানিকক্ষন জিরিয়ে নিয়ে ব্যাগটাকে কোলে টেনে নিলো সালমা। তারপর ব্যাগ থেকে একটা শাড়ি টেনে বের করতে করতে বললো, এবার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকো। আমার দিকে তাকাবে না।

অন্ধকারের মধ্যেই বড়োভাইয়ের মুখে মুচকি হাসি খেলে গেলো।

ঘন অন্ধকারের মধ্যেও যেন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সালমাকে। উঠে দাঁড়িয়ে একটানে শরীর থেকে শাড়িটাকে খুলে ফেললো সে। পট পট করে ব্লাউজের হুক খুলে পেছনে নিয়ে ফেলো দুটো হাত। খুলে দিলো ব্রা’র হুকটা। প্রায় বাতাবি লেবু সাইজের সালমার বুক দুটো বড়োভাইয়ের চোখের উপর দুলতে থাকলো। সায়ার দড়িতে হাত রাখলো সালমা। এবার চোখ দুটো বন্ধ করলো বড়োভাই। প্যান্টের ভিতর কেউ একটা যেন জেগে উঠেছে। ঠান্ডার মধ্যেও চনমন করে উঠলো সারা শরীর। বড়োভাই জানে সায়া খোলার পর কি করবে সালমা। তাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলো।

মিষ্টি একটা চকোলেট গন্ধ ভেসে এলো হাওয়ায়। বড়োভাই চোখ বন্ধ রেখেই বুঝতে পারছে এই গন্ধের উতস্থল কোথায়। সব কিছু ছাড়ার পর নতুন শাড়িটা শরীরে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে সালমা বললো, তিনটে মাল আনতে পেরেছি। দেখে নাও। সুগন্ধী কনডোমের মধ্যে ভরা সোনার তিনটে বাটের দিকে তাকিয়ে ফের মুচকি হাসলো বড়োভাই।

-ভাগ্যিস তোদের একটা বাড়তি ফাঁকা দিয়েছিলো আল্লা।

এবারে সত্যি সত্যিই  হিস হিস করে উঠলো সালমা। অন্ধকারের মধ্যেই বড়োভাইয়ের চোখে চোখ রেখে বললো, ওই বাড়তি ফাঁকের লোভেই তো তোমরা দুনিয়াদারী জাহান্নামে দিতে পারো।

খ্যাঁক খ্যাঁক করে  হেসে উঠলো বড়োভাই।

ভোরের আজানের ধ্বনি কাঁটাতারের ওপার থেকে ভেসে আসছে। এখনও জেগে ওঠেনি জনপদ। হাল্কা কুয়াশার চাদরের ফাঁক দিয়ে সবে ফ্যাকাসে একটা রেখা উঁকি দিতে শুরু করেছে পূব আকাশে। গ্রামের শেষ প্রান্তে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনটে ট্রাক। ট্রাক ভর্তি সব গরু। কিছুক্ষনের মধ্যেই কাঁটাতারের ফাঁকা অংশ দিয়ে গরুগুলোকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ওপারে। গুটি কতোক আবছায়া মূর্তি গরুগুলোকে টেনে নামাচ্ছে ট্রাক থেকে। এখন এই তল্লাটের ধারে কাছেও বিএসএফের কোনও গতাগম্য নেই। অবশ্য থাকার কথাও নয়। সেটা ভালো করেই জানে আবছায়া মূর্তিগুলি। যে কারনে একরকম নিশ্চিন্তে গরু ট্রাক থেকে নামিয়ে ওপারে পাঠানোর তোড়জোড় চলছে। ছটা তাগড়াই সাইজের গরুকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে জঙ্গলের ধারে নিয়ে এলো একটা ছায়ামূর্তি। সেখানে আগে থেকেই গ্লাভস হাতে পরে দাঁড়িয়ে ছিলো অপর একটা ছায়ামূর্তি। গরুগুলো আসতেই চোখের ইশারায় কথা হয়ে গেলো দুইজনের মধ্যে। একজন  এক একটা করে গরুর মুখ চেপে ধরলো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হাতে ছোট্ট সাইজের একটা কৌটো নিয়ে সোজা গরুগুলোর মলদ্বারে ঢুকিতে দিলো অন্য ছায়ামূর্তিটি। সিং বাগিয়ে কিছুটা ছটফট করলেও পরে ফের শান্ত হয়ে গেলো গরুগুলি।

হাত থেকে গ্লাভস খুলতে খুলতে ছায়ামূর্তিটি প্রায় নির্দেশের সুরে বললো, বর্ডা্র পার হওয়ার পর রমজানকে আগে জবাই করতে বলবি এই ছটা মালকে। আর পথে খেয়াল রাখবি গোবরের সাথে মাল বের হয়ে না যায়। এরপরই চাপা স্বরে হেই হেই করে গরুগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে কাঁটাতারের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেলো বাকি ছায়ামূর্তিগুলি।

হাতের গ্লাভসজোড়া খূলে ব্যাগে ঢোকানোর পর পকেট থেকে মোবাইল বের করে কানে ফোন লাগালো ছায়ামূর্তি। অপর প্রান্ত থেকে হ্যালো বলতেই সে বললো, বড়োভাই ছটার ল্যাজের গায়ে ‘ট্রিপিল এক্স ওয়াই প্লাস’ চুহ্ন দেওয়া আছে। ফোন করে বলে দাও। এরপরেই ফোন নামিয়ে নিলো সে।

ততোক্ষনে ট্রাকগুলো গর্জন তুলে ফিরতি পথ ধরে নিয়েছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই এই তল্লাট পার হয়ে যাবে তারা।

সকালের আলো ফুটতেই সীমান্তবর্তী এই গ্রামের জনজীবন জেগে উঠেছে। সকালে সবেমাত্র এসে দোজান খুলে ধুপ ধুনো দিয়ে  চায়ের স্টোভে আগুন জ্বেলেছে রপ্তন। গোঁ গোঁ শব্দে আগুনের রেখা ক্রপমশ নীলাভ হতে শুরু করেছে। খদ্দরের চাদর গায়ে গতকালের সেই লোকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে রতনের চায়ের দোকানের দিকে। চায়ের কেটলিতে দুধ ঢালতে ঢালতে খানিকটা অবাক চোখে লোকটার দিকে তাকালো রতন। মনের মধ্যে অনেকগুলো প্রশ্ন কিলবিল করছে ওর। মনে সাহস নিলো। লোকটা যদি দোকানে ঢোকে তাহলে আজ জিজ্ঞেস করে ফেলবে।

সূর্যের আলোটা রতনের চা দোকানের মধ্যে এসে পড়েছে। হাল্কা শীতের ইমেজের মধ্যে বেশ মিঠে মনে হচ্ছে রোদ্দুরটা। সোজা রতনের দোকানে ঢুকে বাঁশের বেঞ্চের উপর বসে পড়লো খদ্দরের চাদর গায়ে লোকটা। রতনের দিকে না তাকিয়েই চায়ের অর্ডার দিলো। তারপর দোকানে রাখা সংবাদপত্রটা টেনে নিলো।

-মশাই কি কাল রাতে এই গ্রামেই ছিলেন? সাহস করে জিজ্ঞেস করে ফেললো রতন।

পেপার থেকে চোখ না তুলেই উত্তর এলো, হুম।

-কার বাড়িতে উঠলেন?

এবার গোঁফের তলায় হেসে উত্তর এলো, আত্মীয়র বাড়তে।

চায়ের কাপে চিনি ফেলে চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে রতন জিজ্ঞেস করলো, আপনি কি পুলিশের লোক?

হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা নিতে নিতে লোকটা বললো, আমাকে দেখে কি পুলিশের লোক  বলে মনে হচ্ছে?

এবার বেশ থতমত খেয়ে গেলো রতন। বুঝতে পারলো, লোকটা খুব একটা সুবিধার নয়। ফলে চুপচাপ হয়ে গেলো সে।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে এবারে লোকটা বললো, আমি এদেশে থাকি না ভাই। ভালো দালাল থাকলে জানাবেন তো। আমরা ইট ভাটায় কাজ করতে এদেশে এসেছিলাম। আমার কয়েকজন বন্ধু কাল পরশুর মধ্যে এখানে আসবে। ওরা এলেই ওপারে পার হয়ে যাবো।

লোকটার কথা শুনে এবার রীতিমতো বিষম খেয়ে উঠলো রতন। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা রতনের চোখ জোড়া যেন আচমকা কুঁচকে উঠলো। মনে মনে বিড়বিড় করলো, এ লোক ভাটায় কাজ করে! হতেই পারে না। রতন নিশ্চিত, নির্ঘাত এ লোক পুলিশের খোচর।  গতকাল সুবিমল কাকা ঠিকই বলেছে। তাই প্রতুত্তরে শুধু আচ্ছা বলেই থেকে গেলো রতন।

ফের কাগজে মনোনিবেশ করেছে লহদ্দরের চাদর গায়ে লোকটা। ধীরে ধীরে চায়ের দোকানে একজন দুইজন করে খদ্দের আসতে আরম্ভ করেছে। লোকটা বাঁশের বেঞ্চের এক কোণায় বসে যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাগজ পড়েই চলেছে।

(চলবে)       

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।