এখনও ওরা আছে (পর্ব ৪)

লিখছেন শঙ্খচিল

শীতের বেলা সেখতে দেখতে কখন পার হয়ে যায় বোঝা মুশকিল। দুপুরে কোনওদিনই বাড়িতে যায় না রতন। দুপুরে রতনের বউ এসে রুটি তরকারি দিয়ে যায় দোকানে। এদিনও তার ব্যাতিক্রম হলো না। দুপুর নাগাদ বউ এসে টিফিন কৌটোতে করে খাবার দিয়ে চলে গিয়েছে। খাবারের কৌটো খুলতে খুলতে রতন ফের খদ্দরের চাদর পরা লোকটার কথা মনে পড়লো। বড়ো অদ্ভূত মানুষ। আজও দোকান ছেড়ে যাওয়ার আগে একটা একশো টাকার নোট দিয়ে গিয়েছে। অথচ চা খেয়েছে মাত্র তিনবার। আর গোটা দুয়েক বিস্কুট। লোকটার কাছে তো ঋণী হয়ে যাচ্ছে রতন। শুকনো রুটির সঙ্গে ঢেঁড়স ভাজা ভরে মুখে তুলতে তুলতে ভাবলো, দূর, মাল দিচ্ছে কামিয়ে নাও। আমি তো আর ঠকাচ্ছি না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামতে শুরু করেছে। এবেলা আর রতনের চায়ের দোকানে দেখা মিললো না খদ্দরের চাদর পরা লোকটার। তবে বেশ কয়েকটা অপরিচিত মুখ দেখেছে রতন। গ্রামে যে বড়োসড়ো একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে তা যেন বারবার ওর মন ডেকে বলছে। এর আগে এমন সভ অদ্ভূত লোকজনের আসা যাওয়া গ্রামে দেখেনি রতন।

সন্ধ্যের আলো জ্বালতেই সুবিমল কাকা এসে দোকানে ঢুকলো। সেই সকাল থেকে সুবিমল কাকার জন্য মনে মনে অপেক্ষা করে ছিলো রতন। গোটা গ্রামের মধ্যে শ্রদ্ধা ভক্তি বলতে এই মানুষটাকেই করে রতন, একসময়ে স্কুলে শিক্ষকতা ছাড়ার পর এখন নিজেই বাড়িতে বিনা পয়সায় গ্রামের গরীব ছেলে মেয়েদের পড়ান তিনি। সুবিমল কাকার দুই ছেলেই কলকাতায় থেকে চাকরি করে। বাড়িতে কাকা ও কাকিমা দুই জনেই থাকেন। সুবিমল কাকার কাছে আজ সকালে লোকটার কথাগুলো বলবে বলে সবে মুখ খুলতে যাবে, সেই সময় দূরে নজরে পড়লো খুব দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে দুটো আলোর চোখ। ভালো করে বোঝার চেষ্টা করলো রতন। তারমধ্যেই সুবিমল কাকা বেঞ্চে বসে জিজ্ঞেস করলো, গ্রামের পরিস্থিতি মোটেই ভালো ঠেকছে না রে। অলটপকা কথাবার্তা কাউকে কিছু বলে ফেলিস না যেন।

কাকার কথার উত্তরে সবে কিছু একটা বলার জন্য তৈরি হচ্ছে রতন, সেই সময়ে দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো একটা পুলিশ ভ্যান। রীতিমতো চমকে উঠলো সে। সন্ধ্যের পর সচারাচার গ্রামে কখনও পুলিশ ঢুকতে দেখেনি রতন। হুটপাট করে তিন চারজন কনস্টেবেল জিপ থেকে নেমে সোজা রতনের চায়ের দোকানে ঢুকলো। গোটা চারেক চায়ের অর্ডার দিয়ে একজন রতনকে জিজ্ঞেস করলো, অ্যাই, এখান থেকে বিএসএফ ক্যাম্পে যেতে কতো সময় লাগবে রে?

প্রশ্নকর্তার মুখের দিকে না তাকিয়েই রতন উত্তর দিলো, গাড়িতে মিনিট কুড়ি।

চা খেতে ফের জিপে উঠে গেলো কনস্টেবেলগুলো। মুহুর্তের মধ্যে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে ছুটলো জিপটা। অবাক বিস্ময়ে সুবিমল কাকার দিকে তাকালো রতন।

ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় রাত আটটা। দোল মন্ডবের সিঁড়ি বেয়ে প্রায় বিকে হেঁটে উপরে উঠে এলো সালমান। বড়োভাইয়ের কাছে এসে গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললো, বড়োভাই গ্রামে পুলিশ ঢুকেছে। তাছাড়া উটকো পাটকা বেশ কিছু লোকজনও গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেটা বলতেই এসেছি। সাবধানে থেলো। ভাঙা একটা গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে বেশ খানিকক্ষন চুপ করে থাকলো বড়োভাই। সালমান আবার ফিসফিস করে বলে উঠলো, খদ্দরের চাদর গায়ে একটা অচেনা লোককে আজ বিকালে এখান দিয়ে যেতে দেখেছি। খুব একটা সুবিধার মনে হয়নি লোকটার তাকানো টাকানো। সালমানের কথা শুনতে শুনতে জলছাড়া মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে পাশে রাখলো বড়োভাই। তারপর মাথা নীচু করে বেশ খানিকক্ষন ভাবলো। অনেকটা সময় নিয়ে বল্লো, অতো চিন্ত করিস না। ভূতের উপদ্রবটা আবার শুরু হবে। তুই বর্ডার থেকে একটা বেওয়ারিশ মাগী তুলে নিয়ে আয় আজ রাতে।

এবার প্রায় নিঃশব্দে হেসে উঠলো সালমান। তারপর ফলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তুমি একা নাকি, আমরাও ভাগ পাবো?

এবারে আর একবার গ্লাসে রাখা মদটাকে গলায় চালান করে দিয়ে সামলানের পিঠে হাত রাখলো বড়োভাই। বললো, কলজে ফুটো করার আগে তোরাও…।

বড়োভাইয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই চাপা গলায় খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠলো সালমান। এরপর যেমন নিঃশব্দে উপরে উঠে এসেছিলো, তেমনই নিঃশব্দে নীচে নেমে গেলো।

সালমান, মুস্তাফিকুর, লাল্টু আর ইমরান মিলে কাঁটাতারের এপাশে প্রায় হায়নার মতো শিকারের আশায় ওত পেতে বসে রয়েছে সেই রাত নটা থেকেই। রাত ১১ টা বাজতে চললো অথচ আজ কাউকেই দেখা পাচ্ছে না ওরা। লাল্টু কাঁচা খিস্তি মেরে বললো, ওপারে খানকির পুত বিজিবিগুলো মনে হচ্ছে আজ ঝামেলা পাকাচ্ছে।

কথা শেষ করার আগেই লাল্টুর মুখ চেপে ধরলো ইমরান। কাঁটাতারের ফাঁক গলে পর পর গোটা দশেক ছায়া গুঁড়ি মেরে এপারে ঢুকছে। বুকের মধ্যে আচমকা যেন ধুকপুকানিটা বেড়ে গেলো ওদের প্রত্যেকের। একে একে ছায়াগুলো কাঁটাতার পার হয়ে এপারে বাঁশ বনের জঙ্গলে ঢুকতেই একসঙ্গে হামলে পড়লো ওরা। আগে থেকেই টার্গেট করা দুটো ছায়ামূর্তিটিকে জাপটে ধরে মুখে কাপড় চেপে ধরলো ওরা চারজন। যেন শিকারি হায়না কোন ও শিকার পাকড়াও করলো। তারপর হিড়হিড় করে ছায়ামূর্তি দুটোকে টেনে নিয়ে গেলো বাঁশ বনের গহীনে গ্রামের দিকে। বাকি ছায়ামূর্তিগুলি যে যেদিকে পারলো অন্ধকারের মধ্যেই দৌড় লাগালো। পাকড়াও করা ছায়ামূর্তি দুটো একেবারে ডবকা সাইজের ১৯ থেকে ২৩ বছরের মেয়ে। বোধহয় কাজের লোভেই ইন্ডিয়ায় ঢুকেছিলো। চারজনের হাত থেকে বাঁচতে তীব্র ছটফটানি আর বোবা গোঙানি ছেড়ে আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে মেয়ে দুটো। এবারে বিরিক্ত হয়ে সালমান ঠাটিয়ে চড় কষাল মেয়ে দুটোর গালে। তারপরেই একরকম দুই হাত ধরে হিঁচড়াতে হিঁচড়াতে টেনে নিয়ে চললো জঙ্গলে ভরা নির্জন গ্রামের মেঠো পথ ধরে।

(চলবে)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।