এখনও ওরা আছে (পর্ব ৫)

লিখছেন শঙ্খচিল

রাত ১২ টা বেজে ১০। প্রায় হাফাতে হাফাতে দুটো নারী শরীর একরকম টানতে টানতে মন্দিরের উপর এনে তুললো সালমানরা। দুটোই ডবকা মেয়ে। বড়োভাই তখম মদের নেশায় চুর। মেয়ে দুটোকে মন্দিরের উপর খোলা চাতা;এ ফেলে দম ভরে শ্বাস নিলো সালমানরা। সারা মুখ আর গলা মিলিয়ে কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলেছে মেয়ে দুটোর। বেঁচে না মরে তা বোঝা মুশকিল। টালমাটাল পায়ে উঠে দাড়ালো বড়ভাই।

মালগুলো হিঁদু না মোসলমান রে?

এবার সালমান খ্যাঁক খ্যাঁক করে দাঁত কেলিয়ে বললো, মাগী পেয়েছো ব্যাস। তবে খানকি মাগী যে নয় তা গ্যারান্টি আছে। খেদি, পেঁচি, নুরজাহান আসল জায়গায় তো সব সমান। বলেই আবার দাঁত কেলালো সে।

এবার আর মুখে কোনও কথা না বলে একটি মেয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো বড়োভাই। অপর মেয়েটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো সালমানরা। সামান্য গোঙানির শক্তি পর্যন্ত যেন হারিয়ে ফেলেছে মেয়ে দুটো। সামান্য প্রতিরোধ করার শক্তিও শেষ তাদের শরীরে। নিস্তেজ শরীরের উপর একের পর এক পালা করে চললো নির্যাতন। শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ লন্ডভন্ড করে নিজেদের শরীর ঠান্ডা করলো ওরা। শেষ বারের মতো মুস্তাফিকুর নিজের শরীরের উত্তাপ একটা মেয়ের শরীরে ঢালতে গিয়ে যেন চমকে উঠলো। চাপা গলায় চিতকার করে উঠলো, মাগীর সারা শরীর ঠান্ডা রে। টেঁসে গেছে মনে হচ্ছে। মুস্তাফিকুরের কথা শুনে একসঙ্গে হেসে উঠলো সবাই। জড়ানো গলায় বড়োভাই বললো, বোকাচোদা… দেরী করিস না।

আচমকা কাঁচের বোতল ভাঙার শব্দে চমকে উঠলো সালমানরা। বড়োভাই একটা মদের বোতল মেঝেতে ফেলে চৌচির করে দিলো। তারপর নির্দেশের সুরে বললো, মাগী দুটোর পেটে ভাঙা বোতলের টুকরো ঢুকিয়ে ওপর থেকে নীচে ছুঁড়ে ফেলে দে।

মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই নির্দেশ পালনে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওরা। ফিনকি দিয়ে ওঠা রক্তে ভেসে গেলো ওদের সারা শরীর। তারপর দোল মন্ডপের ছাদ থেকে পাশের ঝোপের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিলো নিথর দুটো শরীর। তারপরেই সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নীচে নেমে এলো ওরা। ওদের সঙ্গে নামলো বড়োভাইও। সকলে মিলে অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে গেলো সীমান্তের ধারে কাঁটাতারের দিকে।

পরদিন সকাল হতেই গ্রাম জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়লো। এক সঙ্গে দু’দুটো মেয়ের লাশ উদ্ধার হয়েছে। ফের গ্রামে ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে বলে সাত সকালেই গ্রামের মহিলারা যে যার বাড়িতে পুজো পাঠের আয়োজন করতে বসেছে। যে রকম নৃশংসভাবে মেয়ে দুটোকে খুন করা হয়েছে তাতে সাত সকালেই তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে গোটা গ্রামে। একটু বেলা বাড়তেই জিপের পর জিপ করে পুলিশ ঢুকতে আরম্ভ করলো গ্রামে। পুলিশে পুলিশে কার্যত ছয়লাপ অবস্থা গোটা গ্রামে। নাম গোত্র পরিচয়হীন এই লাশ কোথা থেকে এলো তা তদন্তে নেমে রীতিমতো কালঘাম অবস্থা পুলিশের। একের পর এক গ্রামবাসীদের জেরা করে চলেছে পুলিশের তদন্তকারী অফিসারেরা। পুলিশের অযাথা হয়রানীর ভয়ে গ্রামবাদীরা যে যার মতো ঘরের ভিত্র সিটিয়ে গিয়েছে। শেষ মাস তিনেক আগে গ্রামে লাশ পাওয়া গিয়েছিলো এক মহিলার। তারপর থেকে ভুতের উপদ্রব কিছুটা শান্ত থাকলেও ফের এই ঘটনায় মুখে কুলুপ এঁটেছেন গ্রামবাসীরা। অজানা আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে যেন সকলকে। দিনের আলোতেই আর দোল মন্ডবের রাস্তামুখো হতে চাইছেন না কেউই। পুলিশ লাশ তুলে নিয়ে যাওয়ার পর কার্যত থমথমে হয়ে গিয়েছে গোটা গ্রাম।

লাশের দপূলতে এদিন সকাল থেকে বেশ ভালোই বিক্রিবাটরা হয়েছে রতনের। দুপুর হতে না হতেই চায়ের দুধ শেষ। বাধ্য হয়ে বিকালে বোর্ড লিখে রতন দোকানের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছে, লিকার ছাড়া দুশ চা পাওয়া যাবে না।  এদিন সকাল থেকে লাশ নিয়ে নানা কথা শুনেছে রতনও। কিন্ত সুবিমন কাকার কথা শুনে মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। যে যা বলছে তা বুঝেশুনে শুধু ঘাড় নেড়ে যাওয়া ছাড়া সকাল থেকে কারো কোনও কথারই উত্তর দেয়নি সে। রতন ভালোই বুঝতে পারছে, গ্রামে আরও বড়ো কোনও ঘটনা ঘটতে চলেছে। কিন্ত সেই ঘটনা কি হতে পারে সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না সে।

এদিন সন্ধ্যের পর কার্যত ফাঁকা চায়ের দোকানে শেষ খরিদ্দার বলতে এলো খদ্দরের চাদর পরা সেই লোকটা। ল্যাম্পের আলোয় লোকটার আজকের চেহারা দেখে কেমন  যেন চমকে উঠলো রতন। চোখ দুটো দেখে মনে হচ্ছে, যেন তীব্র নেশা করে আছে। রাত জাগা শরীরের ক্লান্তি স্পষ্ট। আজ সারাদিন পর এই প্রথম রতনের চায়ের দোকানে এলো সে। লোকটা এসে বাঁশের বেঞ্চে বসতেই কোনও কথা না বলে এককাপ লিকার চা তার দিকে এগিয়ে দিলো রতন। চুপচাপ লিকার চায়ে চুমুক দিলো লোকটা।

সন্ধ্যের পর পরই ফের পুলিশ ভ্যান ঢুকলো গ্রামে। প্রায় জনা ত্রিশের পুলিশ অফিসার ও কনষ্টেবেল। রতনের চায়ের দোকানের সামনে গ্রামে ঢোকার মুখে জনা চারেক কনষ্টেবেলকে নামিয়ে দিয়ে গেলো পুলিশ ভ্যানটি। তারপর বাকিদের নিয়ে সোজা ঢুকে গেলো গ্রামের মধ্যে। লিকার চায়ে চুমুক দিতে দিতে তীঘ্ন দৃষ্টিতে কনষ্টেবেলগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলো লোকটা। রতন আড়চোখে সেটা বারবার লক্ষ্য করে নিয়েছে। রতনের বারবার মনে হচ্ছে, এই বুঝি সেই ‘অনুসন্ধান’ সিনেমার অমিতাভ বচ্চনের মতো পুলিশ কনষ্টেবেলগুলোর সামনে গিয়ে নিজের আইডেন্টটি কার্ড দেখিয়ে ধমক লাগাবে খদ্দরের চাদর পরা লোকটা। কিন্ত সেরকম কিছুই ঘটলো না। চায়ের গ্লাসটা শেষ করে ফের একটা একশো টাকার নোট রতনের হাতে দিয়ে দোকান থেকে উঠে পড়লো সে। লোকটা উঠতেই দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করলো রতন।

পুলিশে ছেয়ে নিয়েছে গোটা গ্রামটা। সেই সন্ধে সন্ধ্যার পর দুবার বিএসএফের জওয়ানরাও গ্রামে ঢুলে পায়চারি করে গিয়েছে। ভয়ে সিটিয়ে রয়েছে গ্রামবাসীরা। গ্রামে ঢোকার মুখে রতনের চা দোকান থেকে ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করে ফেলেছে পুলিশ। চারী বুটের শব্দে রাতের নিঃস্তব্ধতা বারবার খান খান করে গ্রামের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে টহল দিচ্ছে খাকি উর্দিধারীরা। একদিকে পুলিশের ভয়, অন্যদিকে ভুতের আতঙ্ক। সব মিলিয়ে সন্ধ্যের পর নেহাত প্রয়োজন না পড়লে ঘরের বের হচ্ছে না গ্রামের মানুষজন।

রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে হাতে একটা হ্যারিকেন নিয়ে দোকানে এলো রতন। বাড়ি থেকে সামান্য হাফ কিলোমিটার রাস্তা আসতে এদিন পরপর তিনবার পুলিশ আটকেছে তাকে। একগাদা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে অবশেষে দোকানে এসে ঢুকলো রতন। দোকানের পাশেই পুলিশ ক্যাম্প বসেছে। পুলিশের ওয়্যারলেস সেটের একনাগাড়ে বকবকানি কানে আসছে রতনের। দোকানের মেঝেতে বিছানা পাততে পাততে রোতিমতো বিরক্ত প্রকাশ করলো। আজ রাতে আর নিশ্চিন্তে ঘুমটাই হবে না।

বিছানা পেতে মশারির চারটে কোনা টানিয়ে শুয়ে পড়লো রতন। অন্যদিন হলে শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের দেশে চলে যেত। আজ ঘুম আসছে না। সমানে পুলিশের ওয়্যারলেস সেটের কথাবার্তাগুলো যেন কানে সিসার দানার মতো এসে বিঁধছে। আচমকা ওয়্যারলেস থেকে একটা কথা বারবার বলতে শুনলো রতন। ওয়্যারলেসে সেটের ওধার থেকে কেউ একজন একনাগাড়ে বলে চলেছে, গ্রামে জোরদার তল্লাশি চালায়ে হবে। ঝাড়খন্ড থেকে ফোন ঢুকেছে। ট্র্যাক করা যাচ্ছে না নম্বারটা। সুচ স্টপ হয়ে গিয়েছে। রড়িঘড়ি অ্যাকশান নাও। পরমুহুর্তেই এওরান্ত থেকে ভারী একটা গলায় প্রত্যুত্তর শোনা গেলো, ওকে স্যার, এখুনি ফোর্স ঢুকছে। তারপরেই ধুপধাপ করে একনাগাড়ে পায়ের আওয়াজ কানে এলো রতনের।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপরেই রতনের চা দোকানের ভাঙা দরজায় সজোরে লাথি কষালো যেন কেউ। লাফ মেরে বিছানার উপর উঠে বসলো রতন। হেঁড়ে গলায় চিতকার দিলো, কে?

দরজার ওপার থেকে ভারী গলা, দোকানের ঝাঁপ খোল, ভিতরে সার্চ করবো। তড়িঘড়ি লুঙ্গির গিঁট বাঁধতে বাঁধতে দোকানের ঝাঁপ খুললো রতন। সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে দুটো দশাসাই সাইজের পুলিশ কনষ্টেবেল দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়লো। ছোট্ট দোকানের ভিতরে কোনায় কোনায় টর্চের আলো ফেলে চোখ বুলিয়ে বললো, এবার ঘুমিয়ে পড়। রাতে উঠবি না। তারপরেই বেরিয়ে গেলো তারা।

বুকের ভিতর ধুকপুক করে কাঁপছে রতনের। কোনওমতে দোকানের ঝাঁপটা বন্ধ করে ফের এসে বিছানায় শুয়ে পড়োলো।

(চলবে)                  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।