এখনও ওরা আছে (পর্ব ৬)

লিখছেন শঙ্খচিল ।।

এদিন রাতে কাঁটাতারের বেড়া টপকাবার আগে সালমা বারবার করে বারন করতে লাগলো বড়োভাইকে। একইসঙ্গে সালমান, মুস্তাফিকুর, লাল্টু আর ইমরানও বারবার নিষেধ করলো যেতে। ওপারে ভয়ঙ্করভাবে পুলিশের উতপাত শুরু হয়েছে। কটা দিন না যাওয়াই উচিত। কিন্ত কারো কথাতেই কর্নপাত করলো না বড়োভাই। সালমানকে সঙ্গে নিয়ে কাঁটাতারের বেড়া টপকানোর জন্য রওনা দিলো সে। বড়োভাইয়ের সাফ বক্তব্য, আজ শনিবার, আজ ভুতের উপদ্রব না থাকলে ওই তল্লাটে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাবে। ফলে সমস্ত বাধা নিষেধ অমান্য করে কাঁটাতার টপকে জঙ্গলের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলো ওরা।

প্রায় বুক সমান হলুদ খেতের আল বেয়ে বেয়ে নিঃশব্দে দোল মন্ডবের প্রায় কাছাকাছি চলে এলো সুঠাম দেহের মানুষটা। এখানে বট, অশ্বত্থ আর ঘন আমবনে ঘেরা। দিনের বেলাতেও গা ছমছম করে। ভুতের ভয়ে এই তল্লাটমুখো হয়না কেউই। প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে এই অঞ্চলের ধারে কাছে কোনও বসতিও নেই। রাতে শোনা যায়, ভুত, পেত্নী আর অশরীরি সব আত্মাদের আনাগোনা আর চিল চিতকার। নরক গুলজার করা সেই শব্দ কানে পর্যন্ত শুনতে চান না গ্রামের মানুষজন। ওইসব শব্দ শিনলেই নাকি বাড়িতে অমঙ্গল ঘটে। আজ সকালেই দুটো অচেনা মেয়ের লাশ পাওয়া গিয়েছে এখানে। তার উপর আজ শনিবার। সুঠাম শরীরের মানুষটি নিশ্চিত আজ ভুতের দেখা পাওয়া যাবেই। গ্রামে পুলিশে ছয়লাপ থাকলেও এই তল্লাট্র যেহেতু জন-মনিষ্যির বাস নেই তাই পুলিশের টহলদারিও নেই। বহু সময় পরপর একটা করে পুলিশ ভ্যান এই দোল মন্ডবের সামনের রাস্তা দিয়ে চক্কর কেটে যাওয়া ছাড়া জীবন্ত আর কারো দেখা পাওয়া এখানে দুঃস্বপ্নের। একপা, দুইপা করে হলুদের খেত ছাড়িয়ে দোল মন্ডবের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো সুঠাম দেহের লোকটা। চারপাশে তীব্র ঝি ঝি পোকার ডাক। থেকে থেকে মাথার উপর বট অশ্বত্থের ডালের ফাঁক গলে বাদুড়ের পাখার ঝটপটানির আওয়াজ। থেকে থেকে বিচিত্র সব আওয়াজ ভেসে আসছে। ভয়ঙ্কর সেই ডাক। সারা শরীরে যেন আতঙ্কের শিহরণ জাগিয়ে দিয়ে যায়। আস্তে আস্তে ঝোপ ঝাড় ডিঙিয়ে এগিয়ে চলেছে লোকটা।

বনের আড়াল থেকে একটু একটু করে দোল মন্ডবের উঁচু চুড়াটা সবে উঁকি দিতে আরম্ভ করেছে। সেই দিকে চোখ রেখে কয়েক পা এগোতেই ভয়ে গা হাত পা বরফের মতো হয়ে গেলো তার। কি দেখছে সে! একি সত্যি! নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। মেরুদন্ড বেয়ে ভয়ের ঠান্ডা একটা স্রোত গোটা শরীরের ধমনীতে ধমনীতে কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

মন্ডবের উপর ছাদে বিশাল লম্বা লম্বা পা ফেলে কে সত্যিকারের পায়চারি করছে। বিশাল বড়ো তার মাথা। জঙ্গলের মধ্যেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সুঠাম দেহী। ভালো করে তাকিয়ে থাকলো ওই বিশাল সাইজের অশরীরীটির দিকে। অত্যন্ত সন্তর্পনে চাদরের নীচ দিয়ে পকেটে হাত ঢোকালো। ধাতব বস্তুটির স্পর্শ নিয়ে যেন ফের শরীরের উত্তাপকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলো সে। সমানে অদ্ভুতুড়ে ওই অশীরিরি মূর্তিটি মন্ডবের ছাদে পায়চারি করে চলেছে। আর দেরী করা ঠিক নয়। একরকম পায়ে হেঁটে হেলানো একটা আমগাছে চড়লো সে। এই আমগাছের ঘন পাতায় ঘেরা ডালগুলো এঁকেবেঁকে মন্দিরের ছাদের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। প্রায় সরিসৃপের মতো চাদরটাকে গায়ের সঙ্গে পেঁচিয়ে নিয়ে আম গাছের ডালের সাথে নিজের শরীরটাকে মিশিয়ে দিতে একটু একটু করে ডাল বেয়ে মন্ডবের ছাদের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো সে।

মাত্র কয়েক হাত উঠে আসতেই প্রায় ১০ মিনিটের মতো সময় লাগলো সুঠামদেহীর। এবারে বেশ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে অশরীরি ওই বিভতস মূর্তিটি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাদা কাপড়ে ঢাকা তার। সমানে পায়চারী করছে ছাদের পূব থেকে পশ্চিমে। আমগাছের ডালের উপর শুয়ে থেকেই শরীর ছুঁয়ে নিজের হাতটা কোনওমতে পকেটে নিয়ে গেলো সে। ধাতব বস্তুটিকে বের করে নিয়ে এলো হাতের মুঠোয়। এরপর অনেকক্ষন ধরে লক্ষ্য ঠিক করে ট্রিগারে চাপ দিলো সে। অব্যর্থ নিশানা। ছোট্ট একটা শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে মাটির হাঁড়ি গেটে যাওয়ার আওয়াজ। ক্ষীণ একটা আর্তনাদের বৃথা চেষ্টা। পরমুহুর্তেই হুড়মুড় করে লম্বা সেই অশীরীরি মূর্তিটি উলটে পড়ে গেলো মন্ডপের ছাদ থেকে নীচে। সঙ্গে সঙ্গে রণপার বাঁশগুলো হুড়মুড়িয়ে একে অপরের উপর পড়ে গিয়ে রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিলো। চুপচাপ গাছের ডালে শুয়ে থাকলো লোকটা। মনে মনে একটা খিস্তি আওড়ে বিড়বিড় করে বললো, রণপায় চেপে ভুত সাজার শখ মিটিয়ে দিয়েছি বানচোতের।

কিছুক্ষনের মধ্যেই অপর একটি ছায়ামূর্তি মন্ডপের নীচে মাঠের মধ্যে যেখানে সেই অশরীরি নামক লোকটার দেহ এসে পড়েছে সেখানে এসে উপস্থিত হলো। হাতে একটা ব্যাগ ঝোলানো তার। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে রীতিমতো বিচলিত সে। এদিকে সুঠাম দেহের লোকটা গাছের ডালে শুতে নিশ্চিত, দেহটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে এখুনি। রাই আর দেরী নয়। ফের লক্ষ্য ঠিক করে ট্রিগার চাপলো সে। যেন সে নিশ্চিত ওই ব্যাগে কি আছে। এবারে  লক্ষ্য ওই লোকটার হাতে ঝোলানো ব্যাগটা। ট্রিগারে চাপ দিতেই মুহূর্তে ব্যাগে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। মনে হলো, ব্যাগের মধ্যে রাখা একসঙ্গে পাঁচটির উপর বোমা ফাটলো। গোটা গ্রামের মাটি কেঁপে উঠলো সেই বিস্ফোরণে। ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো দেহটা। তড়িঘড়ি প্রায় চিতার মতো গাছের ডাল থেকে নীচে ঝাঁপ দিলো লোকটা। একরকম দৌড়াতে দৌড়াতে ঢুকে গেলো গহীন হলুদ খেতের ভিতরে।

(চলবে)               

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।