দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে হনুমা বিহারি ও অশ্বিন টেস্ট ড্র করল

ফোর্থ পিলার

সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের ইতিহাসে লেখা থাকবে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফির তৃতীয় টেস্ট ড্র হওয়ার কথা। দিনের শুরুতে যে লড়াইটা শুরু করেছিলেন ঋষভ পন্থ ও চেতেশ্বর পূজারা। পূজারা একদিক ধরে রেখেছিলেন স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে। পন্থ শুরু করেছিলেন কাউন্টার পাঞ্চ।

ঋষভ পন্থ ও চেতেশ্বর পূজারা আউট হওয়ার পরে জয় মাত্র সময়ের অপেক্ষা। এমনই ভেবেছিল অস্ট্রেলিয়া। তাতে জল ঢেলে দিলেন এই দুই ব্যাটসম্যান। হনুমা বিহারি করেছেন মাত্র ২৩ রান। অন্যদিকে অশ্বিনের ব্যাটে এসেছে ৩৯ রান। কিন্তু রানের পাশের কলামে রয়েছে আসল গল্পটা। এই দুই ব্যাটসম্যান মিলে খেলেছেন মোট ২৮৯ বল। অর্থাৎ প্রায় ৪৯ ওভার। সিডনিতে দেখা গেল ঝড়। সিডনি দেখল দাঁতে দাঁত চেপে তাঁদের লড়াই। হ্যামস্ট্রিং বেঁধে খেললেন বিহারি।অন্যদিকে বুকে বল খেয়েও দাঁড়িয়ে থাকলেন অশ্বিন। শেষ সেশনে উইকেট পড়তে দিলেন না। আর ম্যাচের পঞ্চম দিন দেখিয়ে দিল টেস্ট ক্রিকেটের আসল ট্রাজেডি।

হ্যাজলউডের বলে পুজারা যখন আউট হন, তখনই জয়ের স্বপ্ন ছেড়ে দিয়েছিল ভারত। কিন্তু বাকি ৫ উইকেটে টিকে থাকতে হত এক সেশনের বেশি। তার মাঝে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পাওয়ায় দৌড়তেই পারছিলেন না বিহারি। তাই ঠিক করলেন দাঁড়িয়ে থেকেই খেলবেন। রান হল না। কিন্তু উইকেটও পড়ল না। সব অস্ত্র প্রয়োগ করলেন অজি অধিনায়ক টিম পেইন। কিন্তু দুই ব্যাটসম্যান যখন তাঁদের লক্ষ্যে অবিচল থাকেন, তখন কীরকম একাগ্রতা দেখাতে হয়, তা দেখালেন ভারতের দুই ব্যাটসম্যান।

বিহারি ও অশ্বিন জানতেন, তাঁদের পরে রয়েছেন শুধুমাত্র রবীন্দ্র জাদেজা। যিনি প্রথম ইনিংসে হাতে ফ্র্যাকচার হওয়ায় দ্বিতীয় ইনিংসে বলও করতে পারেননি। আর তাই তাঁরা ভালভাবে জানতেন, যা করার তাঁদেরই করতে হবে। সেটাই হল। রাহুল দ্রাবিড়ের জন্মদিনে এর থেকে ভাল উপহার আর কিছুই হতে পারে না। কয়েক বছর আগে যে কাজটা সিডনির মাঠে দ্রাবিড় করতেন, সেটাই এদিন করলেন বিহারি-অশ্বিন।

পঞ্চম দিনের শুরুতেই ন্যাথন লিওঁর বলে ম্যাথু ওয়েডের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান রাহানে। আগের দিনের সঙ্গে কোনও রান যোগ না করেই আউট হন অধিনায়ক। তারপরে পুজারার সঙ্গে পার্টনারশিপ গড়েন পন্থ। হনুমা বিহারির আগে এদিন তাঁকে নামায় ম্যানেজমেন্ট। আর নেমে নিজের কাজটা খুব ভালভাবে করলেন ভারতের এই উইকেট কিপার-ব্যাটসম্যান।

পন্থ নামার পরে রানের গতি অনেকটাই বেড়ে যায়। পুজারা নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে খেললেও আক্ররমণাত্মক ছিলেন ঋষভ। বেশ কিছু বড় শট খেলেন তিনি। মাত্র ৬৪ বলে নিজের হাফসেঞ্চুরি করেন পন্থ। অন্যদিকে সলিড দেখাচ্ছিল পুজারাকেও। ধীরে ধীরে দলের রান এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা। লাঞ্চের বিরতি পর্যন্ত আর কোনও উইকেট পড়েনি ভারতের। উল্টে এক সেশনে ১০০-র বেশি রান ওঠে।

লাঞ্চের পরেও নিজের খেলার ধরন পাল্টাননি পন্থ। দেখে মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ড সিরিজের মতো অস্ট্রেলিয়াতেও একটা সেঞ্চুরি আসবে তাঁর ব্যাট থেকে। কিন্তু ৯৭ রানের মাথায় কভারের উপর দিয়ে লিওঁকে ছক্কা মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন তিনি।

পন্থ আউট হতে খেলার গতি কিছুটা বাড়ান পুজারা। কামিংসকে এক ওভারে পরপর তিনটে চার মারেন তিনি। অন্যদিকে নিজের সময় নিচ্ছিলেন বিহারি। ৭০ রানের মাথায় হ্যাজলউডের একটা নিচু হয়ে যাওয়া বলে লাইন মিস করে বোল্ড হলেন পুজারা। তিনি আউট হতেই ভারতের আশা অনেকটা কমে যায়। চায়ের বিরতি পর্যন্ত বাকি সময়টা খেলেন বিহারি ও অশ্বিন।

চায়ের বিরতির পরে দেখা গেল এক ঐতিহাসিক লড়াই। কুড়ি-বিশের দুনিয়ায় এই ধরনের ইনিংস শেষবার কবে দেখা গিয়েছিল সেটাই মনে করতে পারছেন না ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। ক্রিজের মাঝে যেন দুই সন্ন্যাসী ধ্যান করলেন। অস্ট্রেলিয়ার স্লেজিং, পিচের অসমান বাউন্স, বিশ্বের সেরা টেস্ট বোলারও তা ভাঙতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত ১৩১ ওভার খেলে ৫ উইকেটে ৩৩৪ রানে শেষ হল ভারতের ইনিংস। বিহারি ১৬১ বলে ২৩ রান ও অশ্বিন ১২৮ বলে ৩৯ রান করে অপরাজিত থাকলেন।

এদিন ড্র হওয়ায় টেস্ট সিরিজ ১-১ ব্যবধানে রয়েছে। সিরিজের শেষ টেস্ট ব্রিসবেনে। সেখানে যাওয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক দেখা দিয়েছে। শেষ টেস্ট হবে কিনা তা তো পরের প্রশ্ন। তার আগে বিতর্কিত সিডনি টেস্টের শেষ দিনে ভারত যে লড়াই করল তাকে কুর্নিশ জানাচ্ছে ক্রিকেট দুনিয়া।

চিন মিউজিকের যাবতীয় তাণ্ডব শুষে নিয়ে অজিদের আত্মবিশ্বাসকেই বেসুরো তালে বইয়ে দিয়েছিলেন হনুমা-অশ্বিন জুটি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।